আজ সোমবার , ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ইং  , ৫ মাঘ ১৪২৭ বঃ , ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২ হিঃ
কবি কাজী নজরুল ইসলাম
কবি কাজী নজরুল ইসলাম - এর ছবি
কবি কাজী নজরুল ইসলাম - এর ছবি

কাজীনজরুল ইসলাম (মে ২৫, ১৮৯৯ — আগস্ট ২৯, ১৯৭৬), বাঙালিকবি, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। বাংলাভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি।পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।তাঁরকবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবিবলা হয়।তারকবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার এবংদাসত্বেরবিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামেরমর্যাদা ওগুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদএবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাইছিলেনসোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণাহাতেতাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে – কাজেই “বিদ্রোহী কবি”।
নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকরেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিলধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিনহিসেবে কাজও করেছিলেন। বিভিন্নথিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনিকবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধেজ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতেকিছুদিন কাজ করার পর তিনিসাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনিকলকাতাতেই থাকতেন। এসময়তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামেঅবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেনবিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা; ধূমকেতুর মতসাময়িকী। জেলে বন্দী হলেপর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। এই সবসাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদেরবিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজএবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণেরসাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মেপ্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদেরবিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবিহিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলাকাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হলইসলামী সঙ্গীত তথা গজল। নজরুলপ্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং সুর করেছেন যেগুলোএখন নজরুল সঙ্গীত বা “নজরুলগীতি” নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।মধ্যবয়সে তিনি পিক্‌স ডিজিজেআক্রান্ত হন। এর ফলে দীর্ঘদিন তাকেসাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়।একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েফেলেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন।এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তাপ্রদান করা হয়। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণকরেন।

জীবনী
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
১৮৯৯খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) ভারতেরপশ্চিমবঙ্গেরবর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকরেন কাজী নজরুলইসলাম। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়াথানায় অবস্থিত।পিতামহ কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদেরদ্বিতীয়া পত্নী জাহেদাখাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেনস্থানীয় এক মসজিদের ইমাম| তারাছিলেন তিন ভাই এবং বোন। তার সহোদর তিন ভাইও দুই বোনের নাম হল: সবার বড়কাজী সাহেবজান, কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন, বোনউম্মে কুলসুম। কাজী নজরুলইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”| তিনিস্থানীয় মক্তবে (মসজিদ পরিচালিতমুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলামধর্ম , দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্বঅধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮খ্রিস্টাব্দে যখন তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তারবয়স মাত্র নয় বছর।পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষা বাধাগ্রস্থহয় এবং মাত্র দশ বছরবয়সে তাকে নেমে যেতে হয় জীবিকা অর্জ্জনে। এসময়নজরুল মক্তব থেকে নিম্নমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেইশিক্ষকতা শুরু করেন। একইসাথে হাজী পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদেরমুয়াজ্জিন (আযানদাতা)হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনিঅল্প বয়সেই ইসলাম ধর্মেরমৌলিক আচার অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিতহবার সুযোগ পান যা তারপরবর্তী সাহিত্যকর্মকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে।তিনিই বাংলা সাহিত্যেইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়।

মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেননা। বাল্য বয়সেইলোকশিল্পেরপ্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো (বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ওনৃত্যেরমিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমান নাট্যদল)| দলে যোগ দেন। তার চাচাকাজী বজলেকরিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবংআরবি, ফারসি ওউর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল। এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায়গান রচনা করতেন।ধারণা করা হয় বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগদিয়েছিলেন।এছাড়া ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবংকবিয়াবাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটোদলেইসাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তাদেরসাথে অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজকর্মববং অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরুকরেন।একইসাথে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ পুরাণসমূহ অধ্যয়ন করতে থাকেন।সেই অল্পবয়সেই তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এরমধ্যে রয়েছেচাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবরবাদশাহ, কবিকালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের গান, বুড়ো শালিকের ঘাড়েরোঁ এবং মেঘনাদবধ। একদিকে মসজিদ, মাজার ও মক্তব জীবন, অপর দিকে লেটো দলেরবিচিত্রঅভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের অনেক উপাদান সরবরাহ করেছে।নজরুলেরএসময়কার কবিতার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে:

“ আমি আল্লা নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে
ফলবে ফসল বেচবো তারে কিয়ামতের হাটে। ”
১৯১০সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। লেটো দলে তারপ্রতিভায়সকলেই যে মুগ্ধ হয়েছিল তার প্রমাণ নজরুল লেটো ছেড়ে আসার পরতাকে নিয়েঅন্য শিষ্যদের রচিত গান: “আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন /ভাবি তাইনিশিদিন, বিষাদ মনে / নামেতে নজরুল ইসলাম, কি দিব গুণের প্রমাণ”| এই নতুনছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল| এর পরভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্রইনস্টিটিউশননামে পরিচিতি লাভ করে। মাথরুন স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষকছিলেনকুমুদরঞ্জন মল্লিক যিনি সেকালের বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।তারসান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস। কুমুদরঞ্জন স্মৃতিচারণ করতেযেয়েনজরুল সম্বন্ধে লিখেছেন,

“ ছোটসুন্দর ছনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাশপরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত।আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম।সে বড় লাজুক ছিল।
যাহোক, আর্থিক সমস্যা তাকে বেশী দিন এখানে পড়াশোনা করতে দেয়নি। ষষ্ঠশ্রেণীপর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়। প্রথমে যোগ দেনবাসুদেবেরকবিদলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবংসবশেষেআসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবে বেশ কষ্টেরমাঝেইতার বাল্য জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এই দোকানে কাজ করার সময়আসানসোলেরদারোগা রফিজউল্লাহ’র’ সাথে তার পরিচয় হয়। দোকানে একা একা বসেনজরুল যেসবকবিতা ও ছড়া রচনা করতেন তা দেখে রফিজউল্লাহ তার প্রতিভারপরিচয় পান।তিনিই নজরুলকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালেরদরিরামপুরস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনিআবাররানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণীথেকেপড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার না দিয়ে তিনিসেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালে নজরুল এখানকারচারজন শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এরা হলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতেরসতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী চেতনা বিশিষ্ট নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসিসাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্য চর্চার নগেন্দ্রনাথবন্দ্যোপাধ্যায়।

সৈনিক জীবন
১৯১৭খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতারফোর্টউইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশেরনওশেরায় যান।প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরুকরেন। তিনিসেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০খ্রিস্টাব্দেরমার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়েরমধ্যে তিনি ৪৯বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টারহাবিলদার পর্যন্তহয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে তিনিফারসি ভাষাশিখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্নবাদ্যযন্ত্র সহযোগেসঙ্গীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাওচলতে থাকে একই সাথে।করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেনতার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প:হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধিইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্নসাহিত্যপত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকা। এইসময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়এবং ফারসি কবিহাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্যচর্চার হাতেখড়িএই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথমবিশ্বযুদ্ধে অংশনেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তুযুদ্ধ থেমেযাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গলরেজিমেন্টভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায়ফিরে আসেন।
সাংবাদিক জীবন ও বিয়ে
যুদ্ধশেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিমসাহিত্যসমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতমকর্মকর্তামুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূলকাজগুলোশুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যেরয়েছেউপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতেরশরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্‌ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্‌। এই লেখাগুলোসাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিতহয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচকমোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায়তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদলপ্রাতের শরাবকবিতা দুটির প্রশংসা করেএকটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এথেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ওসমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যসমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদশহীদুল্লাহ্‌, আফজালুল হক প্রমুখেরসাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতারদুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদারআড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায়অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরভাদুড়ী, শরৎচন্দ্রচট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদমুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্রবন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবরমাসে তিনিশান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকেরবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজীমোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

১৯২০খ্রিস্টাব্দের জুলাই ১২ তারিখে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিকপত্রিকাপ্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেপ্রকাশিতএই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এইপত্রিকারমাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এইপত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেনযার জন্যপত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশেরনজরদারী শুরুহয়। যাই হোক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ওসামাজিক অবস্থাপ্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথেবিভিন্ন রাজনৈতিকসভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষঅভিজ্ঞতা অর্জনেরসুযোগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমেকবিতা ও সঙ্গীতেরচর্চাও চলছিল একাধারে। তখনও তিনি নিজে গান লিখে সুর দিতেশুরু করেননি। তবেব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তার কয়েকটিকবিতায় সুর দিয়েস্বরলিপিসহ পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে:হয়তো তোমার পাবদেখা, ওরে এ কোন স্নেহ-সুরধুনী। সওগাত পত্রিকার ১৩২৭বঙ্গাব্দের বৈশাখসংখ্যায় তার প্রথম গান প্রকাশিত হয়। গানটি ছিল: “বাজাওপ্রভু বাজাও ঘন”।১৯২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের দিকে নজরুল মুসলিম সাহিত্যসমিতির অফিসেগ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানেরসাথে পরিচিত হন। তার সাথেইতিনি প্রথমকুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিতহন প্রমীলাদেবীর সাথে যার সাথে তার প্রথমে পরিণয় ও পরে বিয়ে হয়েছিল।তবে এর আগেনজরুলের বিয়ে ঠিক হয় আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসারখানমেরসাথে।বিয়ের আখত সম্পন্ন হবার পরে কাবিনের নজরুলের ঘর জামাইথাকার শর্ত নিয়েবিরোধ বাধে। নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করেন এবংবাসর সম্পন্ন হবারআগেই নার্গিসকেরেখে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীরবাড়িতে চলে যান।তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলেরপরিচর্যা করেন। একপর্যায়ে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিদ্রোহী নজরুল
তখনদেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নজরুল কুমিল্লাথেকেকিছুদিনের জন্য দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে থেকে আবার কুমিল্লাফিরেযান ১৯ জুনে। এখানে যতদিন ছিলেন ততদিনে তিনি পরিণত হন একজন সক্রিয়রাজনৈতিক কর্মীতে। তার মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গানগাওয়া। তখনকার সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে “এ কোনপাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়, আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনিওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে” প্রভৃতি। এখানে ১৭ দিন থেকে তিনিস্থানপরিবর্তন করেছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবারকুমিল্লায় ফিরেযান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল। এ উপলক্ষেনজরুল আবার পথেনেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সাথে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গানকরেন, “ভিক্ষাদাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী”। নজরুলের এসময়কার কবিতা, গান ওপ্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। এরসর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণহচ্ছে বিদ্রোহীনামক কবিতাটি। বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২২খ্রিস্টাব্দেপ্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ করে।এই কবিতায়নজরুল নিজেকে বর্ণনা করেন –

“ আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,

আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ জ্বালা, চির লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের

আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,

চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর !

আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,

এই ব্যক্তির জীবনী ৩২৭৯ বার পড়া হয়েছে ।
  • নামাজের সময়সূচী

    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২০
    ওয়াক্ত শুরু জামাত
    ফজর ০৪.৪৪ ০৫.১৫
    জোহর ১১.৪৮ ০১.১৫
    আসর ০৩.৫৫ ০৪.৩০
    মাগরিব ০৫.৩৬ ০৫.৪০
    এশা ০৬.৫০ ০৭.৩০
    সূর্যোদয় : ০৫.৫৬ মিঃ
    সূর্যাস্ত : ০৫.৩২ মিঃ
  • Ads

  • অন্যান্য পাতাসমুহ



    Add Address

  • ভিজিটর তথ্য

    আপনার আইপি
    3.239.51.78
    আপনার অপারেটিং সিস্টেম
    Unknown
    আপনার ব্রাউজার
    " অপরিচিত "
  • ভিজিটর কাউন্টার


    free hit counter